Home বাংলা নিউজ পোশাক রপ্তানি বাড়ছে, সস্তার সুবিধা নিচ্ছেন ক্রেতারা

পোশাক রপ্তানি বাড়ছে, সস্তার সুবিধা নিচ্ছেন ক্রেতারা

মহামারি করোনাভাইরাসের আঘাতে ক্ষতির মুখে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতি। এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি বাণিজ্যিক আঘাত হানে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে। একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে এপ্রিলে প্রায় ৮৫ শতাংশ পোশাক রপ্তানি কমে যায়। সেই ধাক্কা কাটিয়ে আবারো রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বাড়তে শুরু করেছে এই শিল্পের। এদিকে মার্কিন পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের অংশগ্রহণে পরিচালিত এক জরিপের ভিত্তিতে তৈরি এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি বাণিজ্যের গতি দুর্বল হলেও সোর্সিং কস্ট বা পণ্য ক্রয়বাবদ ব্যয় বিবেচনায় বাংলাদেশ এখনো আকর্ষণীয়। মূলত সস্তায় পণ্য কিনতেই ঝুঁকি সত্ত্বেও বাংলাদেশমুখী রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক পণ্যের ক্রেতারা। ‘২০২০ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বেঞ্চমার্কিং স্টাডি’ শীর্ষক জরিপটি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের ফ্যাশন অ্যান্ড অ্যাপারেল স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শেং লু। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন ইউনাইটেড স্টেটস ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি এসোসিয়েশন (ইউএসএফআইএ) এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছে। ২০১৪ সাল থেকে এ জরিপ চালিয়ে আসছে ইউএসএফআইএ। এ বছরের জরিপ প্রতিবেদনের সপ্তম সংস্করণ প্রকাশ হয়েছে ৪ঠা আগস্ট। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে ফ্যাশন পণ্য বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব নির্বাহী পোশাক ক্রয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত (সোর্সিং এক্সিকিউটিভ), তাদের দেয়া বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন দেশের পোশাক শিল্প সম্পর্কে তাদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে। জানা গেছে, করোনা প্রাদুর্ভাবে স্থগিত ও বাতিল হওয়া ক্রয়াদেশ ফিরে আসতে শুরু করেছে। বাড়ছে রপ্তানি। আশায় বুক বাঁধছেন এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কা প্রাথমিকভাবে কাটিয়ে আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। আগের স্থগিত হওয়া রপ্তানি আদেশ কিছু ফিরে আসছে। সরকারও পোশাক খাত পুনরুজ্জীবিত করতে আর্থিক ও নীতিগত সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। আশার দিক হলো, করোনার ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিচ্ছে এ খাত। তবে নতুন রপ্তানি আদেশ না আসা পর্যন্ত এ খাতের অনিশ্চয়তা কাটছে না। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের প্রভাবে চলতি বছরের মার্চে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমে ২০.১৪ শতাংশ। এরপর এপ্রিলে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন রপ্তানি কমে ৮৫.২৫ শতাংশে দাঁড়ায়। মে মাসে কমে ৬২ শতাংশ। জুনেও রপ্তানি কমার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। কিন্তু এর ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় কম। অর্থাৎ মাত্র ৬.৬৩ শতাংশ।
ইপিবির তথ্য বলছে, করোনার প্রাদুর্ভাবে পোশাক রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে চলতি বছরের এপ্রিলে। ওই মাসে মাত্র ৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৮৫.২৫ শতাংশ কম। মে মাসে আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১২৩ কোটি ডলারে; যা আগের বছরের চেয়ে ৬২ শতাংশ কম। জুনে এসে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২২৪ কোটি ডলারে, যদিও এ অঙ্ক আগের বছরের চেয়ে ৬.৬৩ শতাংশ কম। তবে আগের মাসের চেয়ে ৮২ শতাংশ বেশি। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফয়সাল সামাদ বলেন, করোনার সময় সবকিছু বন্ধ ছিল, যার কারণে রপ্তানি হয়নি। এখন কিছুটা রপ্তানি হচ্ছে। সবাই তাদের নিজেদের ঘর গোছাচ্ছে। তবে মে-জুন সময়ে যেসব রপ্তানি পণ্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু রপ্তানি করা যায়নি বা রপ্তানি স্থগিত হয়েছিল, ওইসব পণ্য এখন পাঠানো হচ্ছে। অর্থাৎ রি-শিডিউল পণ্যগুলো পাঠানো হচ্ছে। প্রকৃত রপ্তানি আদেশ বাড়েনি। উদ্যোক্তারা জানান, মে মাসের তুলনায় জুনে রপ্তানি বেড়েছে। এটাকে পজেটিভ ধরলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। কারণ সামনে শীতের সময়। এ সময় অনেক অর্ডার আসে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ কাজের অর্ডার হয়। তবে এখন পর্যন্ত সেই অর্ডারগুলো আমরা পাইনি। অর্ডারগুলোর ওপর নির্ভর করবে আগামী বছর কী পরিমাণ পোশাক রপ্তানি হবে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ পোশাক শিল্পের আসল চিত্র বোঝা যাবে।’
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানি আয়ের ৮৪.২০ শতাংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। গত অর্থবছর ২ হাজার ৭৯৪ কোটি ৯১ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৮.১২ শতাংশ কম। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কমেছে ২৬.৮৩ শতাংশ। বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ক্রেতারা আগে যেসব অর্ডার স্থগিত ও বাতিল করেছিলেন, সেই অর্ডার থেকেই এখন কিছু কিছু পণ্য নিচ্ছেন। কিছু নতুন অর্ডারও আসছে। তবে এটি খুবই কম। আগামীতে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তা নিয়ে বায়াররা দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছেন। এদিকে ‘২০২০ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি বেঞ্চমার্কিং স্টাডি’ শীর্ষক জরিপে অংশগ্রহণকারী মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের উত্তরের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে শীর্ষ ১০ ক্রয় গন্তব্যের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের শতভাগ চীন থেকে পোশাক কেনেন। ৯৫.২ শতাংশ ভিয়েতনাম থেকে এবং বাংলাদেশ থেকে ৮৫.৭ শতাংশ পোশাক ক্রয় করেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইনস ও শ্রীলঙ্কা থেকে পোশাক ক্রয় করেন যথাক্রমে ৮১, ৭১.৪, ৬৬.৭, ৫৭.১ ও ৫২.৪ শতাংশ। মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সুবিধাভোগী চীন থেকে সোর্সিং (ক্রয়) কমে যাওয়ায় পণ্যের প্রাথমিক সরবরাহকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকবে ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ, জরিপে এ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন অংশগ্রহণকারীরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, পোশাক সরবরাহকারী হিসেবে ভিয়েতনামের ব্যবহার বেড়েছে ৯.৫ শতাংশ, বাংলাদেশের ব্যবহার বেড়েছে ২৫.৭ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ৪.৮ শতাংশ ও কম্বোডিয়ার ৩.৮ শতাংশ। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের মতে, রপ্তানি বাজারের প্রতি গতিশীল হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল। সোর্সিং কস্ট বা পণ্য ক্রয়বাবদ ব্যয়ে বাংলাদেশ শক্তিশালী। আবার সোস্যাল কমপ্লায়েন্স এবং পরিবেশ কমপ্লায়েন্সে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল।  এরপরও চলতি বছরের জরিপে ক্রেতারা বলেছেন, সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য প্রস্তাব করা দেশের মধ্যে বাংলাদেশসহ আছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত ও শ্রীলঙ্কা। এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ গুরুত্বপূর্ণ মূল্য সুবিধা দেয় এমন তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে মার্কিন বাজারে রপ্তানি হওয়া ৭৭ শতাংশ পোশাক পণ্য ছিল কটনভিত্তিক ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। শ্রম ব্যয় ছাড়াও কটন সুতা-কাপড়ের স্থানীয় উৎপাদনের কারণে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ মূল্য সুবিধায় অবদান রাখছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ এসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন বলেন, বাংলাদেশ এখন ভালো পণ্য তৈরি করছে। সেই পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। এ কারণেই অনেক ক্রেতা বাংলাদেশমুখী হচ্ছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ টেকসই পণ্য তৈরির পথেও হাঁটতে শুরু করেছে। সব মিলিয়েই বাংলাদেশ থেকে পণ্য ক্রয়ের আগ্রহ বেড়েছে মার্কিন ক্রেতাদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here