Home বাংলা নিউজ পোশাক খাতে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার খুলছে

পোশাক খাতে বিদেশি বিনিয়োগের দ্বার খুলছে

তৈরি পোশাক খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সহজ করতে নীতি-নির্দেশনা প্রণয়ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এতে পোশাক খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি কারখানা অবসায়ন বা এক্সিট পলিসি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যদিও খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতারা ঢালাওভাবে বিদেশি বিনিয়োগের দরকার নেই বলে মনে করেন। উচ্চ দামের পোশাক, ফাইবার ও ওভেন ফেব্রিক্স উৎপাদনেই শুধু বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ‘তৈরি পোশাক খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও সহজীকরণ বিষয়ক নীতি নির্দেশনা-২০২০’ প্রণয়ন করেছে। এতে পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণে ১৭টি পদক্ষেপ এবং ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, পোশাক খাতে ঢালাওভাবে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। দেশে গার্মেন্ট পণ্য তৈরিতে যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে। তবে ওভেন ফেব্রিক্স, ম্যানমেইড ফাইবার এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা যায়। এতে সব পক্ষই লাভবান হবে। এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে গার্মেন্ট খাতে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার নেই। তবে ফাইবার বা ফেব্রিক্স উৎপাদনে বিদেশি বিনিয়োগকে কাজে লাগানো যেতে পারে। ফাইনাল প্রোডাক্ট বানাতে দেশে পোশাক খাতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে। বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শর্তসাপেক্ষে গার্মেন্ট খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। উচ্চমূল্যের পোশাক ও ওভেন ফেব্রিক্স উৎপাদনে শুধু সুযোগ দেয়া উচিত। কারণ, এখনও ৬০ ভাগ ফেব্রিক্স চীন থেকে আমদানি করতে হয়। আর উচ্চমূল্যের পোশাকে বিদেশি বিনিয়োগ এলে শ্রমিকদের দক্ষতা-সক্ষমতা বাড়বে, যা পরে দেশীয় উদ্যোক্তারা কাজে লাগাতে পারবেন। তবে গতানুগতিক অর্থাৎ বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা যেসব আইটেম তৈরি করেন, সেসব খাতে ঢালাওভাবে বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। নীতি-নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নিলে রফতানির লিড টাইম কমে যাবে। একই সঙ্গে ব্যবসার পদ্ধতি সহজ করা হলে বিনিয়োগ বাড়বে। নতুন শিল্প স্থাপন হবে। এতে একদিকে যেমন ব্যবসার খরচ কমবে, তেমনি বাড়বে ব্যবসার পরিধি। ফলে এই খাতের টেকসই ও সুষ্ঠু বিকাশ ঘটবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাত আরও বেশি অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এতে আরও বলা হয়, পোশাক খাতের কাঁচামাল বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করার উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা কাঁচামাল আমদানিতে এখন বেশ সময় লাগে। এতে লিড টাইম বেড়ে যায়। ফলে ব্যবসার খরচও বাড়ে। এ ছাড়া নীতি সহায়তা প্রদান ও শুল্কনীতির সমন্বয়সাধন করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে একটি কমিটি করে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে নীতি-নির্দেশনায় পোশাক খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণে ১৭টি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে : পণ্য আমদানি-রফতারি সঙ্গে সম্পর্কিত সব অনুমোদন ও কারখানা স্থাপনের জন্য সনদ গ্রহণে অপ্রয়োজনীয় কাগজ জমা এবং ক্ষেত্রবিশেষে দ্বৈততা পরিহার করতে হবে। এ ছাড়া রফতানি নীতিতে উল্লিখিত সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়ন এবং এলডিসি উত্তোরণ-পরবর্তী সময়ে তৈরি পোশাক খাত যাতে বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কের বাণিজ্য সুবিধা পায়, সে বিষয়ে নেগোশিয়েশনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি আর্টিফিশিয়াল ও ম্যানমেইড ফাইবার উৎপাদনে ওভেন খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হবে। বিশ্ববাজারের চলমান ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পোশাক রফতানি অব্যাহত রাখা এবং গ্লোবাল ভ্যালু চেইনে দেশের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রচলিত ও অপ্রচলিত বাজার অনুসন্ধান এবং বাজারগুলোর চ্যালেঞ্জ খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাশিয়া ও সিআইএস দেশগুলোতে বাণিজ্যিক লেনদেনে কার্যকরী উপায় বের করা এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও নেগোসিয়েশন অব্যাহত রাখা। ফ্যাশন ডিজাউন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল, মার্চেন্ডাইজিং বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো এবং এ বিষয়ে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এমওইউ করতে হবে। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। শ্রম আইনসহ অন্য আইন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড প্রতিপালন নিশ্চিত করা হবে। স্বল্পমেয়াদি নীতি সহায়তা যেমন: প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, শুল্ককর হ্রাস বা মওকুফের সুপারিশ, নগদ সহায়তা বিষয়ক সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে। অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে স্টাডি ও গবেষণায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বৃদ্ধি করতে হবে, প্রয়োজনে এ বিষয়ে প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। কোভিড-১৯ সংক্রমণজনিত কারণে পোশাক খাত যে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে সরকার গঠিত তহবিল, বিদ্যমান প্রণোদনা প্যাকেজ অব্যাহত রাখা ও প্রয়োজনে যৌক্তিক পরিমাণ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হবে। যেসব কারখানা অবসায়িত (এক্সিট) করতে পারছে না, সেসব কারখানার জন্য ব্যবসায় অবসায়ন কৌশল নির্ধারণ করা হবে। এক্সিট পলিসি গ্রহণের বিষয়ে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন থেকে আমরা এক্সিট পলিসি প্রণয়নের কথা বলে আসছি। একজন ব্যক্তি দীর্ঘ ৩০ বছর ব্যবসা করে কোনো কারণে লোকসানের মুখে পড়ে ব্যবসা বন্ধ করতে চাইলে তাকে সে সুযোগ দেয়া উচিত। উন্নত বিশ্বের সব দেশের এক্সিট পলিসি আছে। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জরুরি ভিত্তিতে এক্সিট পলিসি প্রণয়ন করা উচিত। অনেকে দেনার দায়ে জর্জরিত হয়ে আছে। ব্যাংক লোনসহ পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে তারা ব্যবসা থেকে বের হতে পারছে না। তাদের সুযোগ দিতে এক্সিট পলিসির বিকল্প নেই। শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ গড়তে নীতিসহায়তা প্রণয়নসহ প্রতিবেদনে ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে : বাংলাদেশ ব্যাংকের রফতানির কাগজপত্র ওয়েবসাইটে আপলোড করা সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগী সক্ষমতা অর্জনে পণ্য রফতানিতে লিড টাইম কমিয়ে আনা, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা, ব্যবসার শুরুতে বিভিন্ন সংস্থার অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে কাগজপত্র গ্রহণসহ অন্য কাজের প্রাতিষ্ঠানিক দ্বৈততা পরিহার, বিডা ও বস্ত্র আইনে উল্লিখিত ওয়ানস্টপ সার্ভিস কার্যকর, অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে ব্যবস্থা গ্রহণ, ওভেন খাতে শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ গঠনে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা প্রণয়ন, এলডিসি উত্তোরণ পরবর্তী বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রাপ্তির উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্বল্পমেয়াদি নীতিসহায়তা বিষয়ক ব্যবস্থা গ্রহণ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here